ঢাকাবৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের-সবখবর

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান ঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি

প্রতিবেদক
বার্তা বিভাগ
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫ ৯:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেয়ার👍দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন

মনির হোসেন।। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি নাম যার প্রভাব অভাবনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। এ মহিয়সী মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার জীবন সংগ্রাম, নেতৃত্ব, বিতর্ক ও সাফল্যে ভরপুর যা সত্যিই বর্ণাঢ্য।

ইতিহাস রচনাকারী এই মহিয়সী নারী খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার এক সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার পিতার নাম ইস্কান্দার মজুমদার। শৈশব ও কৈশোর সাধারণভাবে কেটেছে পারিবারিক পরিবেশে। মেজর জিয়াউর রহমানের জীবনসঙ্গী হওয়ার ভেতর দিয়ে একজন গৃহিণী হিসেবেই তার পথচলা শুরু হয়। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে মেজর জিয়াউর রহমান মাতৃভূমির স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বেগম জিয়ার জীবনে এক বড় মোড় আসে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি একজন গৃহিণী থেকে দক্ষ ও দৃঢ় রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়— যা ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি আরও দুইবার (১৯৯৬ ও ২০০১) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাসের অংশীদার হন। তার শাসনামলে গণতন্ত্র, নারীর অধিকার, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক খাতসহ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে তার রাজনৈতিক জীবনকে ফ্যাসিস্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী একটি পক্ষ বিতর্কমুক্ত থাকতে দেয়নি। নানা রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন এবং মিথ্যা মামলার কারণে তিনি বহু চড়াই-উতরাইয়ের মুখোমুখি হন। দীর্ঘদিন কারাবরণ ও অসুস্থতার মধ্য দিয়েও তিনি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাননি। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। তার সাহস, নেতৃত্ব এবং সংগ্রাম তাঁকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে। নারী হয়েও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্থান-পতনের অধ্যায়ের শেষে জানান দিয়েছে  বেগম খালেদা জিয়া’র মৃত্যুর সংবাদ। রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভোর ৬টায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেগম খালেদা জিয়া একটি নাম, এক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এক অদম্য তৎপরতা এবং এক শৃঙ্খল রাজনৈতিক ইতিহাসের মহান গল্প। ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকেই মহান এই মানুষটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধ্রুবতারা হয়ে ওঠেন।

জীবনসঙ্গী স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার পর থেকে নিজের যোগ্যতায় সু-সংগঠিত করেন রাজনৈতিক দল বিএনপিকে। তার নেতৃত্বে বিএনপি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গড়ে ওঠে এবং ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে  বিশ্ব রেকর্ড করে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন  মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে এমন সাফল্যের নজির বিরল।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথ চলা মসৃণ ছিল না যা ছিলো একদিকে গণতান্ত্রিক আচরণ, অন্যদিকে বিরোধী দল ও সরকারে শক্তি প্রদর্শনের অবিচ্ছিন্ন লড়াই। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালনকালীন তিনি দেশকে করেছেন সমৃদ্ধ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জনগণের জন্য অবধারিত করে তিনি গৌরব অর্জন করেন। দেশকে কেন্দ্রীয়ভাবে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা অগ্রাধিকার পায়। তবে একটি কুচক্রী মহল মিথ্যার আবরণে তার রাজনৈতিক জীবনকেও ভর করেছিলো বিতর্কে। তীব্র প্রতিপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ শত্রুতা, দুর্নীতির অভিযোগ ও আর্থ-রাজনৈতিক সমালোচনা এসব সবই তাকে ঘিরে আলোচনার এক কঠিন প্রান্ত তৈরি করেছিল রাষ্ট্রবিরোধী বাহিনী। পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি কখনোই বিরোধিতা-হীন পথে চলেনি; বরং নিজের অবস্থান ও নীতির জন্য লক্ষ লক্ষ সমর্থকের মননে অটল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই মহিয়সী নারী।

রাজনৈতিক জীবনের কঠিনতর চলার পথের মাঝেই দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেছেন খালেদা জিয়া। তার অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসার প্রয়াস  সবকিছুই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। আজ তার মৃত্যু শুধু একটি একজন মানুষ কিংবা নেতার প্রয়াণই নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে এক অনন্ত অসীম অধ্যায় সমাপ্ত হওয়া। তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও তার দল ও সমর্থকদের মনের অগ্রভাগে রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবেই ছিলেন যা পৃথিবীতে বিরল। তাঁর কর্মকাণ্ডে অনুরাগীরাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাকে নিয়ে সমালোচকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নোত্তরও ছিল। কিন্তু যে অবদান রাখলেন জাতির সমৃদ্ধিকরণে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘসময় স্মৃতিগ্রাহী থেকে যাবে অবশ্যই।

শোকের এই সময়ে দলীয় সীমা ছাড়িয়ে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি তার অংশগ্রহণকে সতর্ক মূল্যায়নে নেওয়ার জাতির কর্তব্য। কেনন,ইতিহাস কখনোই একপক্ষীয়ভাবেই লেখা যায় না; তা হয় বিশ্লেষণ ও পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। আজ যদিও বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন, তারপরেও তার রাজনৈতিক অবদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুগ থেকে যুগান্তর আলোচিত থাকবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক মহান অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে। তার আত্মার শান্তি কামনা করে পুরো জাতি।

শেয়ার👍দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন