ঢাকামঙ্গলবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের-সবখবর

বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ রণক্ষেত্র ৪ জন নিহত,পুলিশ সাংবাদিকসহ আহত শতাধিক,কারফিউ জারি

প্রতিবেদক
বার্তা বিভাগ
জুলাই ১৬, ২০২৫ ১১:১২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেয়ার👍দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন

এস.এম.আনোয়ার হোসেন অপু।। জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশ ঘিরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ। দফায় দফায় সংর্ঘষে ৪জন নিহত এবং পুলিশ,সাংবাদিকসহ কমপক্ষে শতাধিক আহত হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশ শেষে মাদারীপুর যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর। এরপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

নিহতরা হলাে- জেলা শহরের উদয়ন রোডের সন্তোষ সাহার ছেলে যুবলীগ সদস্য দীপ্ত সাহা (২৫), শহরের থানাপাড়ার কামরুল কাজীর ছেলে রমজান কাজী (২৪), সদর উপজেলার আড়পাড়া এলাকার আজাদ তালুকদারের ছলেে ইমন তালুকদার (১৮) এবং টুঙ্গিপাড়া গ্রামের ইদ্রিস মোল্লার ছেলে সোহেল মোল্লা (৩৫)। এরা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে বলে গোপালগঞ্জ আড়াইশ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ শেখ মোঃ নাবিল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান। পরবর্তিতে রাত ৮টা থকেে পরেরদিন বৃহস্পতিবার ৬টা র্পযন্ত কারফিউ জারি করা হয়। এসব ঘটনায় জেলা শহর সহ আশপাশ এলাকায় ভিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বুধবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, বিকেলে তিনজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁরা গুলিবিদ্ধ ছিলেন। হাসপাতালের কর্মকর্তা জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, আরও ৯ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের অস্ত্রোপচার চলছে।

এর আগে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় সড়ক অবরোধ করে কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের গাড়িবহরে হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বুধবার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে জেলা শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ বাধা দিতে গেলে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।  পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছুড়তে দেখা গেছে। এ সময় নেতাকর্মীদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে এনসিপি নেতাদের নিয়ে পিছু হটতে দেখা গেছে।  এই কর্মসূচি ঘিরে গোপালগঞ্জ সদরে বুধবার সকালে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। হামলা করা হয়েছে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িতেও।

এদিকে, গোপালাগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশে আওয়ামীলী ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা – চট্রগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসুচি পালন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীরা । বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ব্লকেড কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।  বুধবার বিকালে সংগঠনটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

নিহত দীপ্ত সাহার চাচা হাসপাতালে বলেন, দীপ্ত দুপুরের খাবার খেয়ে তাঁর দোকানে যাচ্ছিলেন। শহরের চৌরঙ্গীতে তাঁর পেটে গুলি লাগে। নিহত রমজান কাজীর বাবা কামরুল কাজী বলেন, ‘আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলছে। আমার ছেলে তো কোনো দোষ করেনি। আমি আমার সন্তানকে কোথায় পাব?’ নিহত সোহেল মোল্লা গোপালগঞ্জ শহরের চৌরঙ্গী এলাকার কেরামত আলী প্লাজায় মোবাইল ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন একই মার্কেটের দোকানদার জনি খান।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, সমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলা চালান। এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এনসিপির নেতা-কর্মীরা অন্যদিক দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

হামলার ঘটনার পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালিয়েছেন। এ সময় পুলিশ-সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের (এনসিপি) বলা হয়েছিল, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু তাঁরা সমাবেশস্থলে এসে দেখেন, পরিস্থিতি ঠিক নেই।

এর আগে বেলা পৌনে ২টার দিকে সমাবেশ শুরুর আগে ২০০ থেকে ৩০০ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে এনসিপির সমাবেশস্থলে যান। সে সময় মঞ্চের আশপাশে থাকা পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে দ্রুত আদালত চত্বরে ঢুকে পড়েন। একই সময়ে মঞ্চে ও মঞ্চের সামনে থাকা এনসিপির নেতা-কর্মীরাও দৌড়ে সরে যান। যাঁরা হামলা চালান, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে এনসিপির নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন। ওই সময় হামলাকারীরা মঞ্চের চেয়ার ভাঙচুর করেন, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। একপর্যায়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। এনসিপির নেতা-কর্মী ও পুলিশ এক হয়ে ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। বেলা ২টা ৫ মিনিটে সমাবেশস্থলে পৌঁছান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানে সমাবেশ করে এনসিপি। সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলার ঘটনা ঘটে।

এর আগে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে গোপালগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট সড়কের সদর উপজেলার কংশুরে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, গাড়ি পোড়ানোর সময় সেখানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের গোপালগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. পিয়ালকে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা পিয়াল ভাইয়ের সাথে আছি।’

গোপালগঞ্জের হামলাকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বতীকালীন সরকার। বুধবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এই বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে অন্তর্বতীকালীন সরকার জানায়, গোপালগঞ্জে সংঘটিত সহিংসতা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। বিপ্লবী আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে যুবকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সমাবেশ করছিল। হামলার মাধ্যমে সমাবেশের এই অধিকার রুদ্ধ করা তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের লজ্জাজনক উদাহরণ। এতে বলা হয়, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের গাড়ি ভাঙ্গচুর করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবে সহিংসভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই জঘন্য কাজটি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন সহিংসতার কোনো স্থান নেই। আমরা সেনাবাহিনী ও পুলিশের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের প্রশংসা করি, এবং যারা এসব হুমকির মাঝেও সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে সমাবেশ চালিয়ে গেছেন, সেই ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

জাতীয় নাগরিক পার্টির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে ন্যক্কারজনক হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশে গণআন্দোলনের জোয়ার দেখে আতঙ্কিত হয়ে আওয়ামী দোসররা এখন অরাজকতার চরম ছক আঁকছে। দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বুধবার বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেনের পাঠানো এক বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার👍দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন